
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহ অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। তবে চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সারা বছরের কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়নি। নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেলে দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা বলা হয়েছে।
বদলে গেছে নদী ও পানির চাহিদা
চুক্তিটি যখন করা হয়েছিল, তখন ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের জলপ্রবাহের তথ্যের ওপর অনেকটা নির্ভর করা হয়েছিল। গত তিন দশকে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অতিবৃষ্টির মতো পরিস্থিতিতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে।
একই সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে পানি ব্যবহারের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে পুরোনো হিসাবের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে কম পানিপ্রবাহের প্রভাব শুধু সেচ ও কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মৎস্য, নৌপরিবহন এবং পদ্মাসহ সংশ্লিষ্ট নদ-নদীর পরিবেশগত ভারসাম্যও জড়িত। এ কারণে বাংলাদেশ আরও পূর্বানুমানযোগ্য পানি পাওয়ার ব্যবস্থা চায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ৪০ হাজার কিউসেক পানি এবং বন্যার তথ্য আদান-প্রদানে আরও কার্যকর ব্যবস্থা চাওয়ার অবস্থান নিয়েছে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ
গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিহার রাজ্য পুরোনো চুক্তি নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
বিহারের নেতারা অভিযোগ করছেন, বর্তমান ব্যবস্থায় রাজ্যের পানীয় জল, সেচ ও উন্নয়ন চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে চুক্তিটি বর্তমান কাঠামোয় নবায়ন না করার দাবি উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বিহারের পানির প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। ফারাক্কা ব্যারাজ এই রাজ্যে অবস্থিত এবং কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে ফারাক্কার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ফলে নতুন কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির প্রয়োজনের পাশাপাশি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর চাহিদাও বিবেচনায় আসতে পারে।
এবার কি বদলাবে চুক্তির কাঠামো?
পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার শুধু আগের ৩০ বছরের চুক্তি একইভাবে নবায়নের বদলে আরও নমনীয় কোনো ব্যবস্থা আসতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ভারত শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনে বেশি নমনীয়তা এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের পানির প্রয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইতে পারে ন্যূনতম পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা, শুষ্ক মৌসুমে বেশি পানি এবং নদীর প্রবাহ ও বন্যার তথ্য দ্রুত আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা।
নতুন চুক্তির মেয়াদও আলোচনার বিষয় হতে পারে। ৩০ বছরের পরিবর্তে তুলনামূলক কম মেয়াদের চুক্তি হলে ভবিষ্যতের পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ী দুই দেশ নিয়মিতভাবে পানি বণ্টনের কাঠামো পর্যালোচনা করতে পারবে।
শুধু পানি ভাগ নয়, পুরো নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের চুক্তির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে এর ধারণাগত কাঠামোয়। ১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল প্রশ্ন ছিল—ফারাক্কায় যে পানি পাওয়া যায়, তা কীভাবে ভাগ করা হবে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার বাস্তবতায় ভবিষ্যতের চুক্তিতে নদীর পানি সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার, পলি ব্যবস্থাপনা, বন্যার পূর্বাভাস, তথ্য আদান-প্রদান এবং পুরো গঙ্গা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে যৌথ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় যুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারত ইতোমধ্যে যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট যৌথ কমিটির মাধ্যমে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে কলকাতায় সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হলেও তখন কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি।
গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এবার বিষয়টি শুধু একটি পুরোনো চুক্তি নবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক পানির চাহিদা ও দুই দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নতুন করে পানি ভাগাভাগির কাঠামো তৈরির প্রশ্ন সামনে এসেছে।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :